ম্যাজিক রিয়েলিজম (Magic Realism) বা জাদুবাস্তববাদ হলো সাহিত্যের এমন একটি আখ্যানরীতি, যেখানে চরম অলৌকিক বা অদ্ভুত কোনো ঘটনাকে ফ্যান্টাসি হিসেবে নয়, বরং একদম স্বাভাবিক ও প্রাত্যহিক বাস্তবতার মতো করে উপস্থাপন করা হয়।
লাতিন আমেরিকার এখানে জাদু বা অলৌকিকতা কোন কৃত্রিম সংযোজন নয়, বরং সমাজের মানুষের যাপিত জীবনের অঙ্গ। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের মিথ, উপনিবেশের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং ভৌগোলিক পরিবেশ থেকেই এর জন্ম। সেখানকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে মৃতদের আত্মা ঘুরে বেড়ায় বা মানুষ বাতাসে ভেসে যেতে পারে। যেমন,গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস যখন One Hundred Years of Solitude-এ বৃষ্টি না থামার কথা বলেন বা রেমেদিওসের স্বর্গে উড়ে যাওয়ার বর্ণনা দেন, তিনি তা কোনো রূপক বা অলংকার হিসেবে লেখেননি; বরং সাধারণ লাতিন আমেরিকান জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে লিখেছেন। অর্থাৎ, সেখানে জাদুই বাস্তবতা, বাস্তবতাই জাদু। এটি কোনো সাহিত্যিক কৌশল নয়, এটি তাদের জীবনের অর্গানিক সত্য।
অন্যদিকে ইউরোপে ম্যাজিক রিয়েলিজম ফ্রানৎস রোহ (Franz Roh)-এর চিত্রকলার ব্যাখ্যা বা আধুনিকোত্তর ইউরোপীয় সাহিত্যিক চিন্তা থেকে এর উদ্ভব। ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যুদ্ধোত্তর হতাশা ও পরাবাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য একে কৌশল হিসেবে নেওয়া হয়।এটি একধরনের সচেতন শিল্প-কৌশল (Stylistic Device)। লেখক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি কাল্পনিক বা অদ্ভুত উপাদানকে বাস্তব গল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন, যাতে সমাজ বা দর্শনের কোনো গভীর রূপক ফুটিয়ে তোলা য,কাফকার Metamorphosis-এ গ্রোগোর পোকা হয়ে যাওয়া বা গুন্টার গ্রাসের The Tin Drum-এ ড্রাম বাজিয়ে গ্লাস ভেঙে ফেলার ক্ষমতা—এগুলো ইউরোপীয় যাপিত সংস্কৃতি ছিল না। এগুলো ছিল লেখকের সচেতনভাবে ব্যবহৃত প্রযুক্তি বা ‘টেকনিক’, যার উদ্দেশ্য আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ বা রাজনৈতিক সংকট ব্যাখ্যা করা।
বাংলা সাহিত্যে ম্যাজিক রিয়েলিজমের প্রথম রূপটি মূলত ইউরোপীয় ধারার মতো একটি সচেতন সাহিত্যিক কৌশল বা লিটেরারি টেকনিক। এই ধারায় লেখকেরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে রাজনীতি, সমাজের ট্রমা বা আধুনিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে ফুটিয়ে তোলার জন্য অলৌকিকতাকে রূপক বা প্রতীকের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ, শহীদুল জহিরের 'জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা' উপন্যাসে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আবুল খায়েরের মৃত্যুর পর তার গলিত লাশের গন্ধ পুরো এলাকাকে থমকে দেয় কিংবা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির ভার বোঝাতে মানুষের গাছে চড়ে বসে থাকার অলৌকিক দৃশ্য তৈরি হয়। এটি বাংলার কোনো প্রাত্যহিক সামাজিক বিশ্বাস নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা ও জাতীয় ক্ষোভকে তীব্রভাবে প্রকাশের জন্য লেখকের সুচিন্তিত নন্দনতাত্ত্বিক কৌশল বা ক্রাফট।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় রূপটি লাতিন আমেরিকার মতো বাংলার যাপিত সংস্কৃতি ও লোকমানসের 'ন্যারেটিভের বাস্তবতা'। এই ধারায় অলৌকিকতা কোনো কৃত্রিম ফর্মুলা নয়, বরং বাংলা ভূখণ্ডের হাজার বছরের মিথ, জনশ্রুতি, পীর-আউলিয়ার কারামতি ও গ্রামীণ মানুষের অন্ধবিশ্বাসের স্বাভাবিক রূপ। যেমন—আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোয়াবনামা' উপন্যাসে কাতলাহার বিলের অশরীরী আতঙ্কের কথা বা নিহত ভবানী পাঠকের আত্মার ঘুরে বেড়ানোকে প্রান্তিক কৃষকেরা জীবনের অঙ্গ হিসেবেই মান্য করে। এখানে লেখক অলৌকিকতাকে বানিয়ে আনেননি; বরং বগুড়া-রংপুরের জনমানুষ যেভাবে জাদুময়তাকে বাস্তব সত্য মনে করে জীবনযাপন করে, সেই যাপিত সমাজবাস্তবতাকেই গল্পের বয়ানে সরাসরি তুলে ধরেছেন।